বিকাশ ও বৃদ্ধির প্রাথমিক ধারণা সমূহ-B.ed পরীক্ষার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ

বিকাশ ও বৃদ্ধির প্রাথমিক ধারণা সমূহ

বৃদ্ধি কি/ কাকে বলে?( What is growth?)

শিশুদের দেহের পরিমাণগত পরিবর্তন অর্থাৎ দেহের আয়তন( দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা) ও ওজন বাড়ানোকে বৃদ্ধি বলে।

এই প্রসঙ্গে মনোবিদ Arnold Gessel বলেছেন-” growth is a function of the organism rather than of the environment as such” অর্থাৎ বৃদ্ধি হল দেহ যন্ত্রের ক্রিয়া যা পরিবেশের ক্রিয়া দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত হয় না।

বিকাশ কি/ কাকে বলে?(What is development?

বিকাশ হল ব্যক্তির সেই জাতীয় শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতার পরিবর্তন যার দ্বারা ব্যাক্তি যেকোনো জাগতিক ক্রিয়া-কলাপ কে আরো বেশি দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারে। অর্থাৎ বিকাশ হল বিশেষভাবে আকৃতির পরিবর্তন এবং কাজের উন্নতি।

বৃদ্ধি ও বিকাশের সম্পর্ক কি?( What is the relationship between growth and development?)

বৃদ্ধি ও বিকাশের সাদৃশ্য( Similarities between growth and development):

বৃদ্ধি ও বিকাশ প্রকৃত পরিস্থিতি পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে পৃথক করা যায় না। কারণ পরিমাণগত পরিবর্তন ছাড়া গুণগত পরিবর্তন কে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আবার গুণগত পরিবর্তন ছাড়া পরিমাণগত পরিবর্তনের তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ দুটি প্রক্রিয়া পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। একটি ছাড়া অপরটি ব্যাখ্যা করা যায় না।

বৃদ্ধি ও বিকাশের পার্থক্য( Difference between growth and development):

বৃদ্ধি হল আকার বা আয়তনের পরিবর্তন অর্থাৎ দৈর্ঘ্য ভজনের পরিবর্তনকে বৃদ্ধি বলে। অপরপক্ষে বিকাশ হল আকৃতি ও ক্রিয়ার পরিবর্তন। যার দ্বারা ব্যাক্তি যেকোনো জাগতিক ক্রিয়া-কলাপ কে আরো বেশি দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারে।

বৃদ্ধি হল পরিমাপ যোগ্য। অপরপক্ষে বিকাশ হল পর্যবেক্ষণযোগ্য।

বৃদ্ধির সাধারণ বৈশিষ্ট্য সমূহ( General characteristics of growth):

জন্মের পর শিশুর বৃদ্ধি কিভাবে ঘটে সে সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষণা থেকে মনোবিজ্ঞানীরা বৃদ্ধির যে বৈশিষ্ট্য গুলো নির্ণয় করেছেন সেগুলি হল-

i) বংশগতি ও পরিবেশগত মিথস্ক্রিয়ার ফলে শিশুর বৃদ্ধি ঘটে।

ii) জন্মের পর থেকে শিশুর দৈহিক বৃদ্ধির হার বিভিন্ন বয়সে কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে।

iii) জন্ম থেকে আড়াই বছর বয়স পর্যন্ত দৈহিক বৃদ্ধির হার খুব দ্রুত হয়।

iv) আড়াই বছর বয়স থেকে 12 কিংবা 13 বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর দৈহিক বৃদ্ধির হার কমে যায়।

v) 15-16 বছর বয়সে অর্থাৎ কৈশোরে দৈহিক বৃদ্ধির হার আবার বেড়ে যায়।

vi) মেয়েদের 18 এবং ছেলেদের কুড়ি একুশ বছর বয়স পর্যন্ত খুব ধীরগতিতে হলেও দৈহিক বৃদ্ধি ঘটতে থাকে।

বিকাশের সাধারণ বৈশিষ্ট্য সমূহ( General characteristic of development):

বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে মনোবিদ্যা সাধারণ বৈশিষ্ট্য সমূহ নিরুপন করেছেন তা হল-

i) অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া: বিকাশ জীবনকাল ব্যাপী একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া( development is a continuous process)। মাতৃগর্ভে ভ্রূণ অঞ্চলের মুহূর্ত থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন চোখে পড়ে না।

ii) ক্রমসংযোজনশীল প্রক্রিয়া: বিকাশ একটা ক্রমসংযোজনশীল প্রক্রিয়া অর্থাৎ ব্যক্তির বিকাশের যেকোনো পর্যায়ে তার পূর্ববর্তী সকল পর্যায়ের বিকাশের সমষ্টির ফল। ব্যক্তিজীবনে বিকাশ কোন বিশিষ্ট মুহূর্তে হঠাৎ করে আসে না, বিকাশের যেকোনো পর্যায়ে তার পরবর্তী পর্যায় থেকেই আছে।

iii) সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রক্রিয়া: বিকাশের ধারা সামঞ্জস্যপূর্ণ, করণ কোন আচরণের পর কোন আচরণ হবে তা মোটামুটি নির্দিষ্ট। যেমন- প্রত্যেক মানব শিশু প্রথমে হামাগুড়ি দেবে, তারপর হাটতে শিখবে।

iv) শৃঙ্খলিত প্রক্রিয়া( development is discipline process): মানব জীবনে বিভিন্ন দিকের বিকাশের মধ্যে একটি শৃঙ্খলা বজায় থাকে। একদিকের বিকাশ অপরদিকে বিকাশে সহায়তা করে। যেমন- দৈহিক বিকাশ মানসিক বিকাশ কে প্রভাবিত করে, আবার মানসিক বিকাশ সামাজিক বিকাশে সহায়তা করে অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে সমস্ত ধরনের বিকাশে ব্যক্তিজীবনে একটি শৃঙ্খলা বজায় রেখে চলে ।

v) জটিল প্রক্রিয়া: মানবজীবনে বিকাশ একটি উন্নত জটিল প্রক্রিয়া( development is a complex process)। বিকাশের ধারায় দেখা যায়, কোন বিশেষ সময়ে মানসিক বিকাশের তুলনায় দৈহিক বিকাশের হার বেশি হয় । আবার কখনো দৈহিক বিকাশের তুলনায় মানসিক বিকাশ অনেক বেশি হয়। কোন কোন সময় বিভিন্ন দিকের বিকাশ বিভিন্ন দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন হয় । এই বিকাশের হার কোন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে না।

বৃদ্ধি ও বিকাশের স্তর এবং পর্যায়ক্রম( stage and sequence of growth and development):

মাতৃগর্ভে জীবনের শুরু থেকে তার পরবর্তীকালে একটি শিশুর জীবন অসহায় থেকে যায় যদি না বৃদ্ধি ও বিকাশ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিণত বয়সের দিকে এগিয়ে যায়। বিভিন্ন মনোবিদ বিকাশকে অনুশীলন করার জন্য বয়স ও বিকাশমূলক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মানুষের জীবন কালকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করেছেন-

মনোবিদ পিকুনাস বয়স অনুযায়ী মানুষের জীবন কালকে দশটি স্তরে ভাগ করেছেন, সেগুলি হল-

i) প্রাক জন্ম স্তর: মাতৃগর্ভে প্রথম গর্ভসঞ্চার এরপর থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত

ii) সদ্যজাত স্তর: জন্মের পর থেকে প্রথম চার সপ্তাহ

iii) প্রাথমিক শৈশবের স্তর: এক মাস বয়স থেকে দেড় বছর বয়স পর্যন্ত

iv) প্রান্তীয় শৈশবের স্তর: দেড় বছর বয়স থেকে আড়াই বছর বয়স পর্যন্ত

v) প্রাথমিক বাল্য স্তর: আড়াই বছর বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত

vi) মাধ্যমিক বাল্য স্তর: পাঁচ বছর বয়স থেকে 9 বছর বয়স পর্যন্ত

vii) প্রান্তীয় বাল্য স্তর: 9 থেকে 12 বছর বয়স পর্যন্ত

viii) যৌবনা গমের স্তর: 12 থেকে 21 বছর বয়স পর্যন্ত

ix) প্রাপ্তবয়স্ক স্তর: 21 থেকে 70 বছর বয়স পর্যন্ত

x) বার্ধক্য: 70 বছরের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত

দারিদ্র কাকে বলে?( what is poverty?)

সাধারণত দারিদ্র বলতে যে বিষয়গুলি বোঝায় সেগুলি হল- জীবনযাপনের সমাজভিত্তিক স্বাভাবিক মনের অভাব, জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম বিষয় যেমন- খাদ্য, বাসস্থান, পোশাক স্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্রয়োজনীয় মাত্রায় সংগ্রহ করতে না পারা। অর্থ জমি ও ঋণ ইত্যাদি আহরণে অসমর্থ। সম্পদের অভাবে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন ও তার অক্ষমতা। নিরাপত্তার অভাব বোধ থেকে হতাশাগ্রস্থ অবস্থা।

সুযোগের অভাব বলতে কি বুঝায়? ( what is lack of opportunity)

প্রত্যেক শিশু জন্মসূত্রে কিছু ক্ষমতা, প্রবণতা ইত্যাদি প্রাথমিক মানসিক উপাদান নিয়ে জন্মায়। এই ক্ষমতা ও প্রবণতাগুলো সঠিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা। রাষ্ট্র সমাজ বা পরিবারের কাছ থেকে জীবনধারণের জন্য কিছু সাধারণ সুযোগ-সুবিধা পাওয়া শিশুর স্বাভাবিক অধিকার। এই সুযোগ সুবিধা গুলি যখন শিশু সঠিকভাবে পায়না বা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তখন তাকে বলা হয় সুযোগের অভাব।

বিকাশে পুষ্টির প্রভাব কি?( what is the effect of nutrition in development?)

দরিদ্র পরিবারের মানুষ তাদের শিশুকে যথাযথ পুষ্টিকর খাবার দিতে পারে না ফলে শিশুর দৈহিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন অপুষ্টিজনিত রোগ যেমন- রিকেট রোগ, রক্তাল্পতা ইত্যাদিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। পুষ্টির অভাবে শিশুর বৌদ্ধিক বিকাশ ব্যাহত হয়। আবার শৈশবে অর্থ উপার্জনের জন্য কাজে নিযুক্ত হওয়ার খেলাধুলা বা শরীরচর্চা সুযোগ পায়না। ফলে দৈহিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

বিকাশে শিক্ষার ভূমিকা কি?( what is the role of education in development?)

দারিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী শিশুরা উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এসব পরিবারের শিশুরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়স হওয়ার আগেই অর্থ উপার্জনের জন্য বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে। এদের অভিভাবকদের পক্ষে যথাযথ শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়না । ফলে এদের মধ্যে পরিছন্নতা বোধ বা স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি হয় না। শিক্ষার অভাবে এইসব শিশুর দৈহিক , মানসিক, সামাজিক ও প্রাক্ষোভিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

বঞ্চনা কি? শিশুদের বিকাশে বঞ্চনার প্রভাব কি?( what is deprivation? what is the effect of its in child development?

মানুষের জীবনধারণের জন্য যা প্রয়োজন তা না পাওয়ার অবস্থাকে বঞ্চনা বলা হয়। অর্থাৎ শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক বিষয়গুলি থেকে কোন না কোন কারনে তার দূরত্ব তৈরি হওয়া। যেসব কারণে শিশু বঞ্চিত হয় সেগুলি হল- মা বাবার স্নেহ ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর দৈহিক, মানসিক ও প্রাক্ষোভিক বিকাশ ব্যাহত হয়। আর্থিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর সামাজিক ও নৈতিক বিকাশ সঠিক হয় না।

বিচ্ছিন্ন পরিবার বলতে কি বুঝায়?( what is disrupted family?

বিচ্ছিন্ন পরিবার বলতে বোঝায়- যেসব পরিবারে বাবা মা সবসময় ঝগড়া করে, বাবা-মার নিজেদের মধ্যে কোন ঝগড়া নাই, দুশ্চরিত্র মদ্যপ পিতা বা স্বার্থপর উদাসীন মার জন্য যে পরিবারের শান্তি নাই, মৃত্যু বা বিবাহ বিচ্ছেদ বা অন্য কোন কারণে শিশুর অল্প বয়সে বাবা মাকে হারিয়েছে এমন পরিবার।

Facebook Comments

Recommended For You

About the Author: বিটুল আলি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *