ভারতীয় পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা ও পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা

স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা:

স্থানীয় আদিবাসীদের দ্বারা যখন জেলা, শহর, গ্রাম প্রভৃতির মত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে শাসন কার্যাদি পরিচালিত হয়, তখন সেই শাসনব্যবস্থাকে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা বলে।

স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা কে দুই ভাগে ভাগ করা হয়-i) পৌর ও ii) গ্রামীণ

  • 1957 সালে বালওয়ান্ট রাই মেহতা কমিট স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার সুপারিশ দেয়।
  • ভারত সরকার 1978 সালে পঞ্চায়েত রাজ ব্যবস্থা কে পরীক্ষা করার জন্য অশোক মেহতা কমিটি গঠন করে।
  • 1986 সালে এল এম সিং হবি কমিটির মাধ্যমে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা সাংবিধানিক মর্যাদা লাভ করে।
  • পঞ্চায়েত রাজ ব্যবস্থার ক্ষমতা রাজ্য সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে।
  • ভারত স্বাধীনতা লাভের আগে তামিলনাড়ুতে পঞ্চায়েত রাজ ব্যবস্থা চালু ছিল।

সংবিধানের 73 তম সংশোধনী আইন:

1993 সালে সংবিধানের 73তম সংশোধনীর মাধ্যমে, একটি নতুন অংশ Part-IX যোগ করা হয়। এই সংশোধনীতে গ্রাম পঞ্চায়েতের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই সংশোধনীর বৈশিষ্ট্য গুলি হল-

  • যে রাজ্যের মোট জনসংখ্যা কুড়ি লক্ষের বেশি নয়, সেখানে পঞ্চায়েতের কোন মধ্যবর্তী স্তর থাকে না। এরূপ রাজ্যে গ্রাম স্তর ও জেলা স্তর নিয়ে দ্বি-স্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েত প্রতিষ্ঠিত হবে।
  • পঞ্চায়েতের জন্য পাঁচ বছরের মেয়াদের একটি স্পষ্ট শর্ত জারি করা হয়েছে এবং শর্তাবলীর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নির্বাচন অবশ্যই করা উচিত। তবে, রাজ্য আইন অনুসারে সুনির্দিষ্ট ভিত্তিতে পঞ্চায়েতটি আগে বিলীন হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিলোপের 6 মাসের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অবশ্যই নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে।
  • রাজ্য সরকারকে প্রতি পাঁচ বছরে একটি ফিনান্স কমিশন নিয়োগ করতে হবে যা পঞ্চায়েতের আর্থিক অবস্থান পর্যালোচনা করবে এবং নিম্নলিখিত বিষয়ে সুপারিশ করবে:রাজ্য কর্তৃক প্রদেয় কর, শুল্ক, টোল, ফি ইত্যাদির বিতরণ যা পঞ্চায়েতের মধ্যে ভাগ করা ,বিভিন্ন স্তর মধ্যে অর্থ বরাদ্দ ও ওকর, টোল, পঞ্চায়েতের জন্য নির্ধারিত ফি এবং এইডস অনুদান।
  • পঞ্চায়েতের প্রতিটি স্তরে এসসি ও এসটিদের জন্য আসন সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। আসনগুলি প্রতিটি স্তরে তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে এসসি এবং এসটিগুলির জন্য সংরক্ষণ করা হবে। সংরক্ষিত আসনগুলির মধ্যে 1/3 অংশ এসসি এবং এসটি-র মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। এছাড়াও প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পূরণ করা মোট আসনগুলির মধ্যে 1/3 অংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। একটি সংশোধনী বিল মুলতুবি রয়েছে যা মহিলাদের জন্য 50% আসন সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা রয়েছে।

ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা:

1959 সালে ভারতের প্রথম ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা গঠিত হয় রাজস্থানের নাগৌর জেলায়। পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় 1957 সাল থেকে। ওই আইনের ভিত্তিতে 1958 সালে অঞ্চল পঞ্চায়েত ও গ্রাম পঞ্চায়েত কে নিয়ে দ্বি-স্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়।1963 সালে প্রণীত পশ্চিমবঙ্গ জেলা পরিষদ আইনে আরো দুটি স্তর গঠনের কথা বলা হয়েছে, যথা- আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদ। এইভাবে পশ্চিমবঙ্গে চার স্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েত ব্যবস্থা গড়ে ওঠে । কিন্তু পরবর্তীকালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের জন্য ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ হয়। এমতাবস্থায় কংগ্রেস সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ পঞ্চায়েত আইন প্রণয়ন করে। এই আইনে চার স্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েত ব্যবস্থার পরিবর্তে ত্রিস্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েত ব্যবস্থার প্রবর্তন এর কথা বলা হয়। 1974 সালে এই আইন রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে। বামফ্রন্ট 1978 সালে তিন স্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে। সেই তিনটি স্তর হল -1) গ্রাম পঞ্চায়েত, ii) পঞ্চায়েত সমিতি ও iii) জেলা পরিষদ

গ্রাম পঞ্চায়েত:

কোন একটি মৌজা কিংবা তার কোন অংশ অথবা পরস্পর সংলগ্ন কয়েকটি মৌজার সমষ্টি বা তাদের অংশসমূহ কে নিয়ে এক একটি গ্রাম গঠিত হবে। আবার প্রতিটি নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোট দাতাদের নিয়ে একটি করে গ্রাম সংসদ গঠিত হয়, গ্রাম সংসদের সভায় কোরাম এর জন্য মোট সদস্যদের 1/10 অংশের উপস্থিতি প্রয়োজন। প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার সব ভোটদাতাদের নিয়ে গ্রাম সভা গঠিত হয়, কোরামের জন্য 1/20 অংশের উপস্থিতি প্রয়োজন হয়।

  • পশ্চিমবঙ্গে মোট গ্রাম পঞ্চায়েতের সংখ্যা 3334 টি।
  • গ্রাম পঞ্চায়েতে 1/3 অংশ তপশিলি জাতি ও উপজাতি ভুক্ত মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে ।
  • ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক(B.D.O) গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রথম সভায় সদস্যগণ নিজেদের মধ্যে একজনকে প্রধান ও অন্য একজনকে উপপ্রধান পদে নির্বাচিত করেন।
  • প্রধান ও উপপ্রধান সহ গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য দের কার্যকালের সাধারণ মেয়াদ পাঁচ বছর।

পঞ্চায়েত সমিতি:

20-60 টি গ্রাম নিয়ে পঞ্চায়েত সমিতি গঠিত হয়। প্রতিটি ব্লকে একটি করে পঞ্চায়েত সমিতি থাকে, ব্লকের নাম অনুসারে পঞ্চায়েত সমিতির নামকরণ হয়।

  • পশ্চিমবঙ্গের মোট পঞ্চায়েত সমিতির সংখ্যা 341 টি।
  • পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে একজনকে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করেন। তাকে কর্মদক্ষ বলা হয় । নির্বাচিত সদস্যদের মেয়াদ 5 বছর।
  • ব্লক পঞ্চায়েত গঠনের জন্য ন্যূনতম কুড়ি লক্ষ জনসংখ্যার প্রয়োজন হয়।

জেলা পরিষদ:

জেলার অন্তর্গত পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিগণ, জেলার মধ্যে বসবাসকারী রাজ্যসভার সদস্য গণ ও জেলা থেকে নির্বাচিত লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় জেলা পরিষদ। দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল গঠিত হওয়ার পর ফাঁসিদেওয়া- খড়িবাড়ি ও শিলিগুড়ি- নকশালবাড়ি পঞ্চায়েত সমিতির দুটি কে নিয়ে শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ গঠিত হয়। 1989 সালে এর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে আর কোন মহকুমা পরিষদ নেই।

  • পশ্চিমবঙ্গের জেলা পরিষদের সংখ্যা 121 টি।
  • জেলা পরিষদের প্রথম সভার সদস্যরা একজনকে সভাধিপতি ও অন্য একজনকে সহকারি সভাধিপতি হিসেবে নির্বাচন করেন।
  • জেলা পরিষদের কর্মসচিব স্থায়ী সমিতি গুলোর কর্মসূচি হিসেবে কাজ করেন।

 

Facebook Comments

Recommended For You

About the Author: বিটুল আলি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *